Home ধর্ম মাজারে কেনো যাবেন?

মাজারে কেনো যাবেন?

by reutersbangla

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
গতকাল শুক্রবার হুট করে মন চাইলো আশেপাশে কোন মাজার জিয়ারত করা।
সেই প্রেক্ষিতে নিজে তৈরি হয়ে মাগরিবের পর বাহির হলাম।
খুব কাছের বন্ধু কে ও বললাম পাঞ্জাবি পড়ে বাহির হইস। সে তাই করলো। বরাবরই আগে নিজের কাজটা কে প্রাধান্য দিবে সেই সুবাদে কল দিলো,তার কাজের জন্য, কিন্তু যে কারণে কল দিলো সেটা হলো না।
সেইজন্য আমি বললাম ” আয় চুনারুঘাট সিপাহ সালার সৈয়দ নাসিরুদ্দিন (রহঃ) উনার মাজার জিয়ারত করে আসি”
শুধু যাইমু আর আইমু।
বেচারা আমার কথা এমন ভাবে রিয়েক্ট করলো, যেমন বুঝা গেছে আমি তাকে কোন সিনেমা হলে যাওয়ার জন্য বললাম।
বেচারা উত্তর দিলো মাজারে কেন আমি যাইমু?
আমি উত্তরে বললাম মাজারে যাওয়া হারাম না কি?
সে উত্তরে বললো না, তা হবে ক্যান? ইত্যাদি,ইত্যাদি আমি নীরবতা পালন করলাম, কারণ এখানে বেশি কথা বললে সম্পর্ক নষ্ট হবে, কারণ রাগের মাথায় কিছু কাউকে বলতে চাইনা।
যাইহোক অনেকের সাথে কন্ট্রাক্ট করেছিলাম কেউ রাতে যাওয়ার জন্য ইচ্ছুক ছিলো না।
যাইহোক ফাইনালি বের বলাম আল্লার ওলীর মাজার জিয়ারতে। 💙
তিনি এমন একজন ওলি যিনি হজরত শাহজালাল (রহঃ) এর ৩৬০ জনের মধ্যে নিকটতম একজন সাথী ছিলেন।
যাদের কারণে আজকে আমরা মুসলমান, মাথা উচু করে বলতে আমার ধর্ম ইসলাম।
সবাই জানেন এদেশে কিভাবে ইসলাম আসলো?
কিভাবে ইসলাম প্রচার,প্রসার হলো?
তাদের এই ঋণের কথা ভুলে যাবেন?
আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় একটা কথা আছে “যার কারণে শিন্নি পাইলাম মুল্লা চিনলাম না”
যাইহোক তারা আল্লাহর নেক বান্দা ছিলেন, যাদের কে আমরা ওলি বলি।
ওলি মানে বন্দু।
আল্লাহ কোরআনে বলেন “জেনে রাখ নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলিদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হবে না। যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। (সূরা ইউনুস ১০: ৬২- ৬৩)
আল্লাহ পাক হাদিসে কুদসী শরিফে ইরশাদ করেন ,”যারা আমার ওলির বিরোধিতা করে আমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষনা করি” ( বুখারী শরিফ)
আরেক হাদিসে এসেছে ” আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস। তিনি বলেন: রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা বলেন-যে ব্যক্তি আমার কোন ওলির সাথে শত্রুতা পোষণ করে
আমি তার বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করি।আমার বান্দার প্রতি যা ফরয করেছি তা দ্বারাই সে আমার অধিকনৈকট্য লাভ করে।আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমেও আমারনৈকট্য হাছিল করতে থাকে।অবশেষ আমি তাকে ভালবেসে ফেলি।যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার কর্ণ হয়ে যাই,
যা দিয়ে সে শুনে।
আমি তার চক্ষু হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে।আমি তার হাত হয়েযাই, যা দিয়ে সে ধরে।আমি তার পা হয়ে যাই,
যে পাদিয়ে সে চলাফেরা করে।সে আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করে, আমি তাকে তা দেই।সে যদি আমার নিকটআশ্রয় চায়,
তাহলে আমি তাকে আশ্রয় দেই।
[সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৬১৩৭]
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আল্লার ওলীদের শান-মান কিছুটা হলেও বুঝা গেলো।
এখন প্রশ্ন হলো আল্লাহর ওলীদের মাজারে কেনো যাবেন?
মাজারে গেলে লাভ ক্ষতি কী হবে?

মাজার জিয়ারত জায়েজ এবং সুন্নাতে রাসুল (সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।

দেখুন প্রমাণ>

ইব্রাহিম বিন মুহাম্মদ (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বছরের প্রারম্ভে ওহুদ যুদ্ধে শহীদদের সমাধি জেয়ারতে যেতেন এবং বলতেন: السلام عليکم بما صبرتم فنعم عقبي الدار.

আপনাদের উপর সালাম! আপনারা আপনাদের ধৈর্যের ফলস্বরূপ আখেরাতে কি চমৎকার জায়গাই না পেয়েছেন।

আবু বকর, উমর এবং ওসমান (রা) একই ভাবে জেয়ারতে যেতেন।

সুত্র: –

১. মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক: ৩:৫৭৩

২. আইনি, উমদাদুল কারী, ৮:৭০

৩. তাবরী, জামি আল কুরআন, ১৩:১৪২

৪. ইমাম সুউতি, দারুল ময়ানসুর, ৪:৬৪১

৫. তাফসীর ইবনে ই কাসীর।

মহানবী (সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: “তোমরা কবর জিয়ারত কর কারণ এই অভ্যাস পরকালের কথা মনে করিয়ে দেয়। (এ হাদিসে নির্দেশ দেয়া হয়েছে)

সুত্র:

১. মুসলিম ১:৬৭১ .. ৯৭৬

২. হাকীম আল মুস্তাদরাক: ১:৫৩১ .. ১৩৯০

পবিত্র মহানবী (সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ‘র রওজা জিয়ারতের ফজিলত: –

নবী করীম (সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: যে আমার রওজা জিয়ারত করবে, কিয়ামতের দিনে তাঁর জন্যে আমার শাফায়াত অবধারিত।

সুত্র:

১. দারুল কুতনী, আল সুনান ২: ২৭৮)

২. বায়হাকি, শোহবুল ঈমান ৩: ৪৯০, এবং ৪১৫৯ এবং ৪১৬০)

৩. হাকীম তিরমিজি, নাওয়াদিরুল উসুল ২: ৬৭)
কবর জিয়ারত সম্পর্কিত আরো হাদিস ও ফিকহ গ্রন্হের উদৃতি :

(১): হযরত বুরহিদাহ্ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা করতে পারো (মুসলিম শরীফ)।

(২) অন্য হাদিস শরীফ উনার মধ্যে আছে: হযরত ইবনে মসউদ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নিশ্চয়ই রসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদেরকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা তা করতে পার। কেননা উহা দুনিয়ার আসক্তিকে কমায় এবং আখিরাতকে স্মরণ করায়। (ইবনে মাযাহ)

(৩) কবর জিয়ারতের বৈধতা প্রসঙ্গে বিভিন্ন হাদীস পরিলক্ষিত হয়, আর এ সমস্ত হাদীসের ব্যাখ্যা হাফেজে হাদীস আল্লামা ইবনে হাযার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনি দিয়েছেন এভাবে:

জেনে রাখুন পুরুষ ও মহিলাদের জন্য কবর জিয়ারত করা এ সমস্ত হাদীসের রায় অনুযায়ী মোস্তাহাব প্রমাণিত, তবে মহিলাদের ব্যাপারে মতানৈক্য আছে।(ফতহুল বারী ফি শরহে বোখারী ৩য় খন্ড ১১৮ পৃষ্ঠা)

(৪) আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন:

কবর জিয়ারত এতে কোন অসুবিধা নেই, বরং এটা মোস্তাহাব। (ফতওয়ায়ে শামী)

(৫): পুরুষের জন্য কবর জিয়ারত করা মোস্তাহাব। (ফিক্বহুস সুন্নাহ্, ১ম খন্ড পৃঃ৪৯৯)

(৬) আল্লামা ইবনে আবেদীন রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন:

ওহোদ পাহাড়ের শহীদগণের (কবর) জিয়ারত করা মোস্তাহাব। ইবনে শায়বা হতে বর্ণিত আছে যে, “রসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বৎসরান্তে ওহোদের শহীদগণের (কবর) জিয়ারত করতে আসতেন। অতঃপর বলতেন, তোমাদের প্রতি সালাম, যেমন তোমরা ধৈর্য্য ধারণ করেছিলে তেমনি পরকালে উত্তম বাসস্থান লাভ করেছ।

(৭) বর্ণিত আছে যে, পরবর্তীতে খলিফাতুল মোসলেমীন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহু ও আমিরুল মো’মেনীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই ধারাকে বজায় রেখেছিলেন। (উমদাতুল ফিক্বাহ)

(৮) বিখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি উল্লেখ করেন: সাইয়্যিদাহ্ ফাতিমা রাদিআল্লাহু আনহু প্রতি শুক্রবার হযরত হামযাহ্ রাদিআল্লাহু আনহু এর কবর জিয়ারত করতে যেতেন, অনুরূপভাবে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিআল্লাহু আনহু স্বীয় ভ্রাতা আবদুর রহমান রাদিআল্লাহু আনহু এর কবর জিয়ারত করার জন্য মক্কা শরীফ যেতেন। (উমদাতুল ক্বারী ফি শরহে বোখারী)

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে এ ফতওয়াই স্পষ্ট প্রমাণিত যে, নিয়ত করে মাজার শরীফ জিয়ারত করা সম্পূর্ণ জায়েজ।

আরো দুইটি রেফারেন্স দিলাম-
(১) হাকিমূল উম্মত মাওলানা আশ্রাফ আলী থানভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন॥ “পুরুষদের জন্য কবর জিয়ারত করা মোস্তাহাব। জিয়ারত করার অর্থ দেখাশুনা। সপ্তাহে অন্ততঃ একদিন কবর জিয়ারত করা উচিৎ। সেই দিন শুক্রবার হওয়াই সবচেয়ে ভাল। বুজুর্গানে দ্বীনের কবর জিয়ারত করার জন্য সফরে যাওয়াও দুরস্ত আছে”। (এমদাদুল ফতওয়া)

(২) হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি শাফেয়ী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা তিনি যখন কোন মাসআলা সমস্যার সমাধানে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন তখন আলমে ইসলামীর সর্বশ্রেষ্ঠ ইমামে আযম ইমাম আবু হানিফা নোমান বিন সাবেত কুফী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর মাজার শরীফে এসে জিয়ারত করে তখায় দু’রাকাত নামাজ পড়তেন। এরপর হযরত ইমামে আযম ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি এর উসিলা দিয়ে আল্লাহ্ পাকের দরবারে ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর সমস্যা জানাতেন। আল্লাহ্ পাক তাঁর দোয়া কবুল করতেন অর্থাৎ মাসআলার যে সমস্যার জালে আবদ্ধ হয়ে তিনি সেখানে যেতেন ইমামে আযম রহমতুল্লাহি আলাইহি এর উসিলার বরকতে তা খুলে যেত। অতঃপর স্বীয় স্থানে প্রত্যাবর্তন করতেন। উল্লেখ্য ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর এ আগমন শুরু হত ফিলিস্তিন হতে, আর এই সূদুর ফিলিস্তিন থেকে আগমনের একমাত্র নিয়ত ছিল মাজার জিয়ারত করা। অন্য কোন উদ্দেশ্যে বাগদাদ এসে মাজার জিয়ারত করা নয় (আন্ নাসিয়াতুলিল ওহাবী)

এ প্রসঙ্গে ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন:

অর্থঃ নিশ্চয়ই আমি ইমাম আযম আবু হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বরকত হাসিল করি। যখন আমার কোন সমস্যা দেখা দেয় আমি তাঁর মাজার শরীফে এসে প্রথমে দু’রাকাত নামাজ আদায় করি। অতঃপর তাঁর উসিলা দিয়ে আল্লাহ্ পাকের নিকট সমস্যা সমাধানের জন্য প্রার্থনা করি। তা অতি তাড়া তাড়ি সমাধান হয়ে যায়। (মুকাদ্দিমা,শামী ১ম খন্ড ৫৫ পৃঃ)

শেষ কথায় বলতে চাইঃ-
কবর ও মাজার জিয়ারত বরকতময় ইবাদত । এই ইবাদত হতে আমাদের বিরত থাকা উচিত নয় । এজন্য আমাদের উচিত :

১। বাবা-মা-দাদা-দাদী-নানা-নানী-আত্ময় স্বজনদের কবর জিয়ারত করা ।

২। বিভিন্ন সময় বিখ্যাত ব্যক্তি ও ইসলাম প্রচারকদের কবর ও মাজার জিয়ারত করা ।

৩। কবর জিয়ারত করার জন্য বিভিন্ন দুয়া-দুরুদ-তাশবীহ-তাহলীল মুখস্হ করা এবং এই ব্যাপারে বাড়িতে পরিবার পরিজন নিয়ে চর্চা অব্যহত রাখা ।

কবর জিয়ারত করলে সোয়াব হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর চিন্তা উদয় হয় এবং পৃথিবী শেষ ঠিকানা উদয় হয় বলে নিজেকে পুন্যবান মুসলিম হওয়ার জন্য কবরস্হান ও মাজারে মাঝে মধ্যে যাতায়াত করা উচিত এবং সেখানে যেয়ে শরিয়াত সম্মত উপায়ে দুয়া-দুরুদ-তাশবীহ-তাহলীল পড়তে হবে ।

লেখক

মোহাম্মদ সিজিল মিয়া

শিক্ষার্থী হবিগঞ্জ দারুচ্ছুন্নাৎ কামিল মাদ্রাস

related posts

Leave a Comment